বাংলাদেশ ক্রিকেটের শত ফুল ফুটুক

Provash-Amin20170320124909-1.jpg

২০০০ সালের ১০ নভেম্বর। ঢাকার বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে রচিত হয়েছিল ইতিহাস। বাংলাদেশের কোনো অধিনায়ক প্রথমবারের মত সাদা পোশাকে টস করতে নেমেছিলেন। বর্তমানে সাংসদ নাইমুর রহমান দুর্জয়ের প্রতিপক্ষ ছিলেন সৌরভ গাঙ্গুলী। প্রথম টেস্টে হারলেও আমিনুল ইসলাম বুলবুলের অসাধারণ সেঞ্চুরি, হাবিবুল বাশার সুমনের হাফ সেঞ্চুরি আর দুর্জয়ের ৬ উইকেটে মাথা উঁচু করেই মাঠ ছেড়েছিল বাংলাদেশ।

তবে অভিষেক টেস্টেই বাংলাদেশ পেয়ে গিয়েছিল দারুণ এক শিক্ষা। প্রথম ইনিংসে ৪০০ করা দল দ্বিতীয় ইনিংসে ভেঙে পড়েছিল ৯১ রানে। এটাই টেস্ট। এখানে মুহূর্তে মুহূর্তে খেলার চেহারা পাল্টে যায়। পাঁচদিনই মনোযোগ ধরে রাখতে হয়। অভিষেক ইনিংসে ৭১ রান করা হাবিবুল বাশার সুমন সেদিন আমার এক অনুষ্ঠানে বলছিলেন, `৪০০ রান করার পর আমরা ভেবেছিলাম আমাদের কাজ শেষ। কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসেই বুঝে গেলাম টেস্ট কাকে বলে।` কিন্তু প্রথম টেস্ট থেকে পাওয়া সেই শিক্ষা বাংলাদেশ কাজে লাগাতে পারেনি। একটু ভালো করলেই আত্মতুষ্টিতে ভুগতে গিয়ে পরমুহূর্তেই হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে।

ইদানিং বাংলাদেশ দারুণ ক্রিকেট খেলছিল। কিন্তু টেস্টে জিততে জিততেও হেরে যাচ্ছিল। কিন্তু শততম টেস্টে অন্যরকম বাংলাদেশ। আর টেস্ট যে একার খেলা নয়, সেটারও ডকুমেন্টারি হতে পারে বাংলাদেশের শততম টেস্ট। সেঞ্চুরি ও ৬ উইকেট নিয়েও ম্যান অব দ্যা ম্যাচ হতে পারেননি সাকিব আল হাসান। সাকিব সিরিজ সেরার পুরস্কার পেলেও ম্যান অব দ্যা ম্যাচ হয়েছেন তামিম ইকবাল। তবে এই ম্যাচের নায়ক অনেকে- মুস্তাফিজ, মুশফিক, মোসাদ্দেক, সাব্বির; সবারই কিছু না কিছু অবদান আছে। এই ম্যাচের আসল নায়ক টিম বাংলাদেশের টিম স্পিরিট।

বলছিলাম অভিষেক টেস্টের কথা। শততম টেস্টে জয়ের মুহূর্তে মনে পড়ে প্রথম টেস্টের স্মৃতি। অভিষেক টেস্টের প্রথম বল থেকে মাঠে বসে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। একটা ছোট্ট গল্পও আছে। লম্বা লাইন ঠেলে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের এক নম্বর গেটে পৌঁছলাম, শুনলাম প্রধানমন্ত্রী আসবেন তাই কড়াকড়ি, মোবাইল নেয়া যাবে না। আমার মাথায় যেন বাজ পড়লো। মোবাইল রাখতে গেলে প্রথম বল মিস করবো। মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিলাম, মোবাইল ডাস্টবিনে ফেলে দেবো। হঠাৎ দেখি পাশের গেটের লাইনে জনকণ্ঠের স্পোর্টস রিপোর্টার মজিবুর রহমান। তার হাতে মোবাইল দিয়ে ঢুকে পড়েছিলাম মাঠে। তারপর ইতিহাস।

আমি কিছুদিন স্পোর্টস রিপোর্টিং করেছি। সেই সুবাদে ক্রিকেটারদের অনেকের সাথেই আমার ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। তবে বাংলাদেশ টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার অনেক আগেই ছেড়েও দিয়েছি। ক্রীড়া সাংবাদিকতা করলে নাকি খেলা নিয়ে আবেগ কিছুটা কমে যায়। কিন্তু আমার কখনো যায়নি। সাংবাদিকতা করার আগে যেমন, ক্রীড়া সাংবাদিকতা করার সময় যেমন, এখনও ঠিক তেমন আবেগ। সম্ভবত ১৯৯৪ সালে ঢাকায় সাফ ক্রিকেট টুর্নামেন্ট হয়েছিল। বাংলাদেশ বেশ ভালো খেলেছিল এবং রানার্সআপ হয়েছিল।

প্রেসবক্সে বাংলাদেশের পক্ষে গলা ফাটালে সিনিয়র সাংবাদিকরা নিবৃত্ত করতেন, সাংবাদিকদের নিরপেক্ষ থাকতে হয়। শুনে আমি চুপচাপ গ্যালারিতে চলে যেতাম। সেখানে ইচ্ছামত গলা ফাটিয়ে, গলা ভেঙে পোস্ট ম্যাচ প্রেস কনফারেন্সে আসতাম। সেই টুর্নামেন্টেই প্রথম ক্রিকেট নিয়ে মানুষের উন্মাদনার শুরু। গ্যালারি ভর্তি দর্শক, দেশজুড়ে আলোচনা। সাফল্যের ভারে বাংলাদেশে জনপ্রিয়তার পাল্লা সেই যে ক্রিকেটে হেললো, আর পাল্লা ওল্টায়নি।

তারপর আইসিসি ট্রফি, বিশ্বকাপে পাকিস্তান বধ, টেস্ট স্ট্যাটাস; তারপর শুধু এগিয়ে চলার গল্প। বাংলাদেশের মানুষ এখন ক্রিকেটে খায়, ক্রিকেটে ঘুমায়। আর এই জন আবেগ আর উন্মাদনাই বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় সাইনবোর্ড। বাংলাদেশ ক্রিকেটীয় সামর্থ্যে কিছুটা পিছিয়ে থেকেও কেনিয়াকে পেছনে ফেলে টেস্ট স্ট্যাটাস পেয়ে গেল, তার অনেকটা কৃতিত্বই জন আবেগের।

বলছিলাম আবেগের কথা। টেস্ট অভিষেকের ১৭ বছর পথপরিক্রমা কলম্বোয় যখন বাংলাদেশ শততম টেস্ট খেলতে নেমেছে, তখনও আবেগে থরোথরো। এই যেমন কাল শততম ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ের পর ভাঙা কোমড় নিয়ে নিউজরুমে যে উল্লাস করেছি, তা দেখলে পাগল বলবেন। শুধু আমি নই, আমাদের গোটা নিউজরুম, আসলে গোটা বাংলাদেশই এখন ক্রিকেটে উন্মাদ। বাংলাদেশে এখন ক্রিকেট মানে আর শুধু নিছক খেলা নয়। ক্রিকেট মানে বাংলাদেশ, ক্রিকেট মানেই দেশপ্রেম। বাংলাদেশ সব ক্ষেত্রেই দ্বিধাবিভক্ত। শুধু এই ক্রিকেটই বিনি সুঁতোর মালায় গাঁথে বাংলাদেশকে। কাল বিকেলে থেকেই বাংলাদেশ ক্রিকেটময়। সবখানে একটাই আলোচনা। এই করা উচিত, সেই করতে পারতো; সব্বাই যেন বিশেষজ্ঞ কোচ।

প্রতিদিনের মত আজ সকালেও আগারগাঁওয়ের নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউটে গিয়েছিলাম ফিজিওথেরাপি নিতে। গিয়ে শুনি সেখানেও চলছে আনন্দের জাবর কাটা। আড্ডায় ফিজিওথেরাপিস্ট সজিব আহমেদ বলছিলেন, কাল বিকেলের একেকটি রান যেন একেকটি আইফোন ৭। আরো বললেন, ২০০ টাকা খরচ করে খেলা দেখেছি। না জিতলে খবর ছিল। খরচের কথা শুনে অবাক হলাম। জানতে চাইলাম, খরচ কিভাবে? বললেন, কাল বিকেলে কাজ ছিল। তাই সিএনজিতে বসে আর রোগী দেখতে দেখতে খেলা দেখেছি মোবাইলে। তার জন্য ২০০ টাকার ডাটা কিনতে হয়েছে। শুনে অবাক হয়ে গেলাম। মুশফিক-তামিম-সাকিবরা কি জানেন তাদের জন্য বাংলাদেশের মানুষের এই যুক্তিছাড়া ভালোবাসার গল্প?

টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের পথচলায় অনেক সাফল্য যেমন আছে, আছে অনেক ব্যর্থতাও, অনেক আনন্দ, অনেক বেদনা, আফসোস, হাহাকার। সবচেয়ে বড় হাহাকার ১০০ টেস্ট খেলতে আমাদের ১৭ বছর লেগেছে। টেস্ট ক্রিকেটে সবচেয়ে কম বয়সে সেঞ্চুরি বাংলাদেশের মোহাম্মদ আশরাফুলের। সবচেয়ে কম বয়সে ম্যাচে ১০ উইকেট নেয়ার কৃতিত্ব এনামুল হক জুনিয়রের। এক ম্যাচে সেঞ্চুরি ও হ্যাটট্রিকের একমাত্র গৌরব সোহাগ গাজীর। ইতিহাসে তৃতীয় ক্রিকেটার হিসেবে একই ম্যাচে সেঞ্চুরি ও ১০ উইকেট নেয়ার কৃতিত্ব সাকিব আল হাসানের। মাত্র তৃতীয় ক্রিকেটার হিসেবে অভিষেকেই ব্যাট ক্যারি করেছিলেন জাবেদ ওমর বেলিম। নিজের দেশের অভিষেকে সেঞ্চুরি করা তৃতীয় ক্রিকেটার আমিনুল ইসলাম বুলবুল। দেশের অভিষেকে সেরা বোলিঙের রেকর্ড নাইমুর রহমান দুর্জয়ের। টেস্ট অভিষেকে ১০ নম্বরে ব্যাট করতে নেমে সর্বোচ্চ ইনিংসের মালিক আবুল হাসান।

অগৌরবের খাতাও কম লম্বা নয়। তবে আজ জয়ের দিনে অগৌরবের কথা বলতে চাই না। খালি আফসোস শততম টেস্ট খেলতে ১৭ বছর লেগে গেল। বাংলাদেশ এখন ওয়ানডেতে স্বীকৃত শক্তি। যে কোনো দলের সাথে পাল্লা দিয়ে খেলে। টি-টোয়েন্টিতেও নিজেদের দিনে বাংলাদেশ বাংলাদেশ ভয়ঙ্কর। কিন্তু সাফল্যের হার সবচেয়ে কম টেস্টে। ১০০ টেস্টে মাত্র ৯টি জয়। এই অগৌরবের সাথে আফসোসের যোগসূত্র আছে। ১০০ টেস্ট খেলতে ১৭ বছর লাগলে ভালো করা সত্যি মুশকিল।

বাংলাদেশ এখন বছরে একটা-দুইটা টেস্ট খেলে। সারাবছর ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টি খেলায় বুঁদ থেকে হুট করে টেস্ট খেলতে নামলে ভালো করা সত্যি মুশকিল। যেমন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যান মমিনুল হক শুধু টেস্ট খেলেন। টানা ১১ ম্যাচে ফিফটি করে ক্রিকেট বিশ্বে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন। আরেক ম্যাচে ফিফটি করতে পারলেই হয়ে যেতো বিশ্বরেকর্ড। কিন্তু বছরে একটা-দুইটা টেস্ট খেললে মনোবল ধরে রাখা সত্যি কঠিন।

ক্রিকেট বিশ্বেই এখন ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টির জয়জয়কার। আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে এখন টি-টোয়েন্টিই বেশি খেলা হয়। কিন্তু আমার কাছে ক্রিকেট মানেই টেস্ট। ওয়ানডে যেমন তেমন, টি-টোয়েন্টিকে আমি ক্রিকেটই মনে করি না, দেখিও না। টি-টোয়েন্টির হাত ধরে ক্রিকেটে যে নোংরা বাণিজ্যের অনুপ্রবেশ ঘটেছে, তা ধ্বংস করে দিচ্ছে ক্রিকেটের মূল চেতনাকেই। এমনিতে আমাদের জীবনযাপনে কোনো অনিয়ম হলে আমরা বলি, ইটস নট ক্রিকেট। কিন্তু সেই ক্রিকেটেই এখন ম্যাচ ফিক্সিঙের বিষ। ক্রিকেটের যে আভিজাত্য, শুভ্রতা তা ফুটে ওঠে টেস্ট ক্রিকেটেই। বাংলাদেশের সাবেক টেস্ট অধিনায়ক মাশরাফি বিন মোর্তজা এখন ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়ক। কিন্তু এখনও তার মধ্যে টেস্ট খেলতে না পারার হাহাকার। গত সপ্তাতে শততম টেস্ট নিয়ে এক লেখায় মাশরাফির আক্ষেপ ‘আহা আবার যদি টেস্ট খেলতে পারতাম।’

মাশরাফির এই আফসোস যখন আমাদের সকল ক্রিকেটারের মধ্যে সঞ্চারিত হবে, তখনই আমরা টেস্টে ভালো করতে পারবো। আর টেস্টে ভালো করতে পারলে সব ফরম্যাটেই ভালো করা যাবে। ওয়ানডে বা টি-টোয়েন্টিতে ভালো দিনে জিততে পারে যে কেউ। ওয়ানডে বা টি-২০তে অনেক আপসেটের রেকর্ড আছে। কিন্তু টেস্ট একদিনের খেলা নয়। পাঁচদিনে ১৫টি সেশনের খেলা। সেশনে সেশনে পাল্টে যায় টেস্টের চিত্র। একটা ভালো ইনিংস বা ভালো স্পেল পাল্টে দিতে পারে টেস্টের চিত্র।

টেকনিক বা স্কিলে ঘাটতি আছে, এমন অনেকেও ওয়ানডে বা টি-২০তে তারকা হয়ে যেতে পারেন। কিন্তু টেস্ট ক্রিকেটে একজন ক্রিকেটারকে সামর্থ্যের সর্বোচ্চটা নিঙড়ে দিতে হয়। বলছি বটে টেস্ট ক্রিকেটের জন্য ভালোবাসারা কথা। কিন্তু মুখে বললেই তো হবে না। একজন নবীন ক্রিকেটার যখন টি-টোয়েন্টিতে অর্থের ঝনঝনানি শুনবেন, তখন টেস্ট ক্রিকেটের ঐতিহ্য আর ভালোবাসার কথা বলে আপনি তাকে ক্রিকেটার বানাতে পারবেন না। তবু্ও কামনা, তরুণরা অর্থ নয়, ক্রিকেটকে ভালোবেসেই ক্রিকেটার হতে আসবেন। আর ক্রিকেট মানেই টেস্ট ক্রিকেট।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের শত ফুল ফুটুক, শত সাফল্য ধরা দিক, শত সম্ভাবনা বিকশিত হোক।

Top