কমিউনিটি ক্লিনিকে সেবাগ্রহীতাদের ৮০ শতাংশ নারী-শিশু

Community-Clinic20170426095948.jpg

কমিউনিটি ক্লিনিক বর্তমানে দেশের স্বাস্থ্যসেবার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে প্রতি ছয় হাজার জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি করে কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা হিসেবে বর্তমানে সারাদেশে ১৩ হাজারেরও বেশি কমিউনিটি ক্লিনিক চালু রয়েছে।

গত আট বছরে (২০০৯-২০১৭) সারাদেশে প্রায় ৫৮ কোটি ৮৯ লাখ নারী, পুরুষ ও শিশু কমিউনিটি ক্লিনিক পরিদর্শন ও চিকিৎসা সেবা নিয়েছে। একই সময়ে ৯৪ লাখ ৭২ হাজারেরও বেশি জরুরি ও জটিল রোগীকে উন্নত ব্যবস্থাপনার জন্য উচ্চতর পর্যায়ের হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে। তবে এ হাসপাতালে সেবাগ্রহীতাদের ৮০ শতাংশ নারী ও শিশু।

বর্তমানে কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যক্রম শুধু দেশেই নয়, দেশের গণ্ডী পেরিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত। বিশ্বের অনেক দেশ কমিউনিটি ক্লিনিক কার্যক্রমকে রোড মডেল বিবেচনায় নিয়ে নিজ দেশে তা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে।

আজ ২৬ এপ্রিল (বুধবার) জাতীয়  কমিউনিটি  ক্লিনিক দিবস। ২০০০ সালের এই দিনে তৎকালীন  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়া  উপজেলার পাটগাতী ইউনিয়নের গিমাডাঙ্গা কমিউনিটি ক্লিনিক উদ্বোধনের মাধ্যমে কমিউনিটি ক্লিনিক সেবা কার্যক্রমের সূচনা করেন। স্বাস্থ্য বিভাগ ২০০৯ সাল হতে ২৬ এপ্রিলকে “কমিউনিটি ক্লিনিক দিবস” হিসেবে পালন করে আসছে।

কমিউনিটি ক্লিনিকের বিভিন্ন কার্যক্রম, অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে আলাপকালে এসব তথ্য জানান  স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় কমিউনিটি বেইজড হেলথ কেয়ার (সিবিএইচসি) অপারেশন প্লানের লাইন ডিরেক্টর ডা. মো. আবুল হাশেম খান।

তিনি জানান, বর্তমানে প্রতিদিন একটি কমিউনিটি ক্লিনিকে গড়ে ৩৮ জন সেবাগ্রহীতা আসছেন। গত আট বছরে প্রায় সোয়া ৮শ’ কোটি টাকার ওষুধ সরবরাহ করা হয়। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি কিছু কমিউনিটি ক্লিনিকে গর্ভবতী মায়েদের স্বাভাবিক ডেলিভারি হচ্ছে। এ পর্যন্ত প্রায় ২৯ হাজার স্বাভাবিক ডেলিভারি হয়েছে।

কমিউনিটি ক্লিনিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নে স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কমিউনিটি গ্রুপ ও কমিউনিটি সাপোর্ট গ্রুপ সদস্য এবং স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিরা; বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ স্থানীয়ভাবে কমিউনিটি ক্লিনিকের দৈনন্দিন পরিচালনা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, স্থানীয়ভাবে তহবিল সংগ্রহ ও ব্যবহার নিশ্চিতকরণসহ পরিচালনায় সার্বিকভাবে সহযোগিতা করছে বলে তিনি জানান।

আলাপকালে ডা. মো.আবুল কাশেম খান কমিউনিটি ক্লিনিক কার্যক্রমের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন।

hashem

তিনি বলেন, কমিউনিটি ক্লিনিক  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চিন্তাপ্রসূত একটি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত কার্যক্রম যা বর্তমান সরকারের সাফল্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, দেশে-বিদেশে নন্দিত। এ কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশের দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত গ্রামীণ জনগণ কাছাকাছি কমিউনিটি ক্লিনিক হতে সমন্বিত স্বাস্থ্য, পরিবার-পরিকল্পনা ও পুষ্টি সেবা পাচ্ছেন। এটি জনগণ ও সরকারের যৌথ উদোগে বাস্তবায়িত একটি কার্যক্রম।

তিনি জানান, জনমুখী এ কার্যক্রম ১৯৯৬ সালে গৃহীত হয়, বাস্তবায়ন শুরু হয় ১৯৯৮ সালে। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত দেশে ১০ হাজারেরও বেশি কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মিত ও অধিকাংশই চালু করা হয় এবং জনগণ সেবা পেতে শুরু করে। কিন্তু ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াতের জোট সরকার ক্ষমতায় এলে কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এ অবস্থা ২০০৮ সাল পর্যন্ত চলমান থাকে। এ দীর্ঘ সময়ে পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকায় এবং নদীভাঙন ও অন্যান্য কারণে ৯৯টি কমিউনিটি ক্লিনিক ধ্বংস হয়ে যায়। টিকে থাকে ১০ হাজার ৬২৪টি ক্লিনিক।

পরবর্তীতে ২০০৯ সালে রিভাইটালাইজেশন অব কমিউনিটি হেলথ কেয়ার ইনিশিয়েটিভস ইন বাংলাদেশ (আরসিএইচসিআইবি) শীর্ষক প্রকল্পের মাধ্যমে কমিউনিটি ক্লিনিক পুনঃরুজ্জীবিতকরণ কার্যক্রম শুরু হয়। এ কার্যক্রমের মাধ্যমে ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত সময়ে নির্মিত কমিউনিটি ক্লিনিকগুলির প্রয়োজনীয় মেরামত, জনবল পদায়ন, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ এবং নতুন নির্মিত কমিউনিটি ক্লিনিক পর্যায়ক্রমে চালু করা হয়। এটি ২০১৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।

প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলে জুলাই ২০১৫ হতে সিবিএইচসি অপারেশনাল প্লানের মাধ্যমে কমিউনিটি ক্লিনিকের সব কার্যক্রম বাস্তবায়ন শুরু হয়ে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হয়। বর্তমানে কমিউনিটি ক্লিনিক কার্যক্রম পরিচালনার লক্ষ্যে চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর কর্মসূচিতে কমিউনিটি বেইজড হেলথ কেয়ার (সিবিএইচসি)  অপারেশনাল প্লান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

ডা. মো. আবুল হাশেম খান জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ উদ্যোগকে আরও বেগবান করতে কমিউনিটি ক্লিনিককে ব্র্যান্ডিং করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ‘শেখ হাসিনার অবদান, কমিউনিটি ক্লিনিক বাঁচায় প্রাণ’ স্লোগানটি কমিউনিটি ক্লিনিকের ব্র্যান্ডিং কার্যক্রমে ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়াও বিশেষ কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।

সম্প্রতি লাইন ডিরেক্টর হিসেবে যোগদান করা এই কর্মকর্তা বলেন, অনেক সফলতা থাকার পর কমিউনিটি ক্লিনিক কার্যক্রম বাস্তবায়নে কিছু সমস্যা ও র্দুবলতা রয়েছে। জনবল রাজস্বকরণ না হওয়াতে অনেক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সিএইচসিপি চাকরি থেকে অব্যাহতি নিয়ে অন্যত্র যোগদান করছেন। প্রথমদিকে নির্মিত কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর অধিকাংশই মেরামত আযোগ্য এবং ভবনগুলোর অবস্থা অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়েছে। মাঠ পর্যায়ে কমিউনিটি ক্লিনিক কার্যক্রম মনিটরিং ও সুপারভিশনের কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা না থাকায় সমন্বিত ও  কার্যকর মনিটরিং ও সুপারভিশন সম্ভব হচ্ছে না।

এসব সমস্যা সমাধানে চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় সিবিএইচসি অপারেশন প্লানে কমিউনিটি ক্লিনিক কেন্দ্রিক বিভিন্ন কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।

এসব কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে (প্রস্তাবিত) নতুন কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ ও জরাজীর্ণ সিসি মেরামত, জনবল স্থায়ীকরণ ও নতুন নিয়োগ, কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে হেলথ আউটকাম পরিমাপ, মাঠপর্যায়ে কার্যকর মনিটরিং ও সুপারভিশন জোরদারকরণ, জনগণের কার্যকরী অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ, কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ, কমিউনিটি ক্লিনিকের টেকসই প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ও উপজেলা স্বাস্থ্য ব্যবস্থা জোরদারকরণ।

Top