আরব দেশগুলোর কাতার বয়কট, যে ধরনের প্রভাব ফেলবে মধ্যপ্রাচ্যে

176429_1.jpg

সৈকত ডেস্ক
কাতারের সঙ্গে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্নের ঘটনা সাম্প্রতি সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সঙ্কটের সৃষ্টি করেছে। অভূতপূর্ব এই কূটনৈতিক সঙ্কটের পর সম্পর্ক ছিন্নকারী দেশগুলো তাদের দেশে বসবাসরত কাতারি নাগরিকদের আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে সেদেশ ত্যাগ করতে আনুষ্ঠানিক নোটিশ প্রদান করেছে। মোট ৯টি দেশ অনির্দিষ্টকালের জন্য কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। প্রায় ২.৩ মিলিয়ন মানুষের দেশ কাতারের বেশিরভাগই বিদেশি শ্রমিক। বর্তমান কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার অধীনে দেশটির ভিতরের জীবন-যাত্রার বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তা করছে দেশটি। এ ঘটনায় পুরোপুরি খাদ্য আমদানি নির্ভর মধ্যপ্রাচ্যের ধনী দেশটি কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। অন্যদিকে, কাতার আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলেছে যে, সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন এবং এই অঞ্চলের অস্থিতিশীলতার অভিযোগ সম্পূর্ণ ‘অযাচিত’ ও ‘ভিত্তিহীন। এসম্পর্কে আপনার যা জানা প্রয়োজন: কি পরিবর্তন হয়েছে?
– শুরুতে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিশর, বাহরাইন ও ইয়েমেন এই পাঁচটি দেশ কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণা দেয়। পরে তাদের সঙ্গে মরিশাস, মৌরি তানিয়া, মালদ্বীপ ও লিবিয়া যোগ দেয়ায় এটি নয়টি দেশে প্রসারিত হয়েছে। – সৌদি আরব কাতারের সঙ্গে তার সকল সীমান্ত, সমুদ্র ও আকাশ পথের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত কাতারের সঙ্গে সব ধরনের বিমান ফ্লাইট ও জাহাজ চলাচল বন্ধ করতে তার বিমানবন্দর এবং সমুদ্রবন্দর বন্ধ করে দিয়েছে। – ইতিহাদ, ইমিরেটস, দুবাই ও গালফ এয়ার কাতারের রাজধানী দোহার সঙ্গে তাদের সব ধরনের ফ্লাইট বন্ধ করে দিয়েছে। কাতার এয়ারওয়েজ বলছে যে, তারা সৌদি আরবের সব ফ্লাইট বাতিল করছে। – কাতারি কূটনীতিকদের তাদের বিদেশি পদ ছেড়ে দিতে নোটিস দেয়া হয়েছে। – সৌদি আরব, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাসরত কাতারি নাগরিকরা জানিয়েছে যে, এসব দেশ ছাড়তে তাদের ১৪ দিন সময় দেয়া হয়েছে এবং এসব দেশ তাদের নিজেদের নাগরিকদেরকে কাতারে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে।
এর পিছনে কি রয়েছে? এটি সত্যিই বেশ জটিল। উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলো মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুডকে সমর্থনের জন্য বারবার কাতারের সমালোচনা করে আসছে। প্রায় ১০০ বছর বয়সী ইসলামপন্থী দলটিকে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে মনে করে থাকে। সংযুক্ত আরব আমিরাত সংগঠনটির তহবিল গঠনের জন্য ‘অর্থায়ন’ এবং ‘আশ্রয়’ দেয়ার জন্য কাতারের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে। তবে, বিশ্লেষকরা বলছেন যে, ইরানের সঙ্গে কাতারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও এই সম্পর্ক ছিন্নের পিছনে কাজ করে থাকতে পারে। দুই সপ্তাহ আগে আল জাজিরারসহ কয়েকটি কাতারি মিডিয়ায় প্রকাশিত কাতারের আমির শেখ তামিম আল হামাদ আল থানির একটি মন্তব্য এই কূটনৈতিক সঙ্কটের সৃষ্টি করে। তার এই মন্তব্যে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও মিশরকে ক্ষুব্ধ করে। ওই মন্তব্যে আল থানি ইরানকে একটি ‘ইসলামি শক্তি’ হিসেবে অভিহিত করেন এবং তেহরানের প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির কঠোর সমালোচনা করেন।
কিন্তু কাতারের পক্ষ থেকে বলা হয় যে, তাদের ওয়েবসাইটটিকে হ্যাক করে কেউ এই মন্তব্য করেছে এবং ৬ জুন মার্কিন কর্মকর্তারা সিএনএনকে বলেন যে, মার্কিন তদন্তকারীরা মনে করছেন এই ঘটনার পিছনে রাশিয়ার হ্যাকাররা জড়িত থাকতে পারে। মার্কিন কর্মকর্তারা বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের মধ্যে একটি ফাটল সৃষ্টি করাই রাশিয়ানদের লক্ষ্য হতে পারে। একাধিক আঞ্চলিক বিষয়ে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্য দ্বন্দ্ব রয়েছে। এর মধ্য অন্যতম হচ্ছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচী এবং সৌদি আরব প্রভাবিত সিরিয়া, লেবানন এবং ইয়েমেনসহ কয়েকটি দেশে তেহরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব বিস্তার। পৃথিবীর বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্রটি কাতার এবং ইরানের মধ্য অবস্থিত। সাম্প্রতিক উপসাগরীয় প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্পদ ব্যবস্থাপনা পরিচালনার বাইরে দেশ দুটির মধ্য ভাল সম্পর্ক রয়েছে। এছাড়াও, ইরানের বিপ্লবী গার্ড ‘কর্পস’র প্রধানের সঙ্গে কাতারের কর্মকর্তারা বৈঠক করেছেন বলেও অভিযোগ ওঠে।
এই বিচ্ছেদের ঘটনা কাতারের জনগণের ওপর কি প্রভাব ফেলবে?
কাতার তেল এবং গ্যাসে সমৃদ্ধ কিন্তু দেশটি তাদের নিজেদের জন্য খাদ্য উৎপাদন করে না। প্রায় সব ধরনের খাদ্যই আসে সৌদি আরব থেকে। বর্তমানে দেশটি তার সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে ফলে খাদ্য দ্রব্যের মূল্য খুব দ্রুত বাড়তে পারে। যদিও রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, খাদ্যদ্রব্যের ঘাটতি পূরণে কাতার প্রত্যাশিত খাদ্য দ্রব্য সংগ্রহ করছে। কাতার এয়ারলাইন্স অন্যতম একটি প্রধান বৈশ্বিক বিমান সংস্থা। কিন্তু বর্তমানে সৌদি আরব, মিশর, বাহরাইন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের আকাশসীমা ব্যবহারে অনুমতি নেই বিমান সংস্থাটির। এর অর্থ হল আফ্রিকা ও উত্তর আমেরিকাগামী ফ্লাইটগুলোকে ঘুরপথে অবতরণ করতে হতে পারে। এতে করে জ্বালানি খরচ, ফ্লাইটের সময় এবং সম্ভাব্য টিকিটের মূল্য বৃদ্ধি পাবে। তবে, দেশটির একটি বড় যুদ্ধ তহবিল রয়েছে। ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত তহবিলে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন সার্বভৌম সম্পদ রয়েছে; যেটি আর্থিক ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সাহায্য করতে সহায়তা করবে। কাতারীয়রা তাদের নিজেদের দেশে সংখ্যালঘু। দেশটিতে প্রায় দুই মিলিয়ন বিদেশি শ্রমিক রয়েছে। এরা প্রধানতঃ ভারত, নেপাল, বাংলাদেশ ও ফিলিপিন্স থেকে আগত।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে কাতারি দূতাবাস সরাসরি ফ্লাইটে বাধার সৃষ্টি হলে তার নাগরিকদের কুয়েত বা ওমানের মাধ্যমে ভ্রমণের পরামর্শ দিয়েছে। এছাড়াও, তাদের টিকিট ক্রয় করার কোনো উপায় না থাকলে টিকেটের জন্যও অর্থ প্রদানের আশ্বাস দিয়েছে। বিশ্বের বাকি অংশে কি প্রভাব ফেলবে?
মধ্যপ্রাচ্যে যেকোনো ধরনের অস্থিরতা তেলের দামের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে এবং এ কারণে দীর্ঘমেয়াদী দাম বেশি থাকে। তাই সম্ভবত আপনার তেলের ট্যাঙ্কটি পূরণ করতে খরচ আরো বেড়ে যাবে। এপর্যন্ত তেল ও গ্যাসের বাজারকে সঙ্কটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সিএফডির প্রধান মার্কেট নীতিনির্ধারক জর্জ ম্যাককেনা বলেন, ‘কাতার হচ্ছে পৃথিবীর বৃহত্তম এলএনজি রপ্তানিকারক। উপসাগরে দেশটির পাইপলাইন রয়েছে
এবং প্রতিশোধ হিসেবে দেশটি তার প্রতিবেশিদের কাছে এর সরবরাহ বন্ধ করে দিতে পারে।’ এছাড়াও, এই কূটনৈতিক সংকট ২০২২ সালের বিশ্বকাপের জন্যও জটিলতার সৃষ্টি করবে। যেটি আয়োজনে কাতার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী হলে এটি আয়োজন নিয়ে বড় ধরনের সঙ্কটের সৃষ্টি করবে। সূত্র: সিএনএন

Top