ঈদ ও কোরবানীর তাৎপর্য

eid.jpg

মাওলানা নুরুল হুদা

প্রত্যেক জাতির জীবনে জাতীয় উৎসব মূলক এমন কিছু দিবস নির্ধারিত থাকে যে দিবস গুলোতে তাদের জাতীয় ঐতিহ্য-ঐক্য ও আনন্দের বহিঃপ্রকাশ ঘটে এবং তারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিবস হিসেবে তা পালন করে। সাধারণতঃ এসব দিবসে তাদের নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাস, চিন্তা-চেতনা, জীবনাদর্শ ও ইতিহাস-ঐতিহ্যের সুস্পষ্ট প্রতিফলন প্রতিভাত হয়। কোন কোন জাতির এসব দিবসে ব্যক্তিপূজা, জাতীয় পূজা, অযাচিত গর্ব-অহংকার, অন্য জাতির উপর নিজেদের অবৈধ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার নিপীড়ন মূলক ইতিহাস নিয়ে গর্ব-আস্ফালন, ধর্মীয়-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক বিকৃতি, আনন্দের নামে অবাধ-মাত্রাজ্ঞানহীন ভোগবাদিতা ও অবৈধ যৌনাচার সহ অনেক অনভিপ্রেত বিষয়াদি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাড়ায়।
ইসলামে ঈদের তাৎপর্য ঃ ইসলাম মুসলমানদের জন্য যে দুটি দিবসকে গোটা মুসলিম বিশ্বের জন্যে জাতীয় দিবস হিসেবে নির্ধারণ করেছে তার একটি ঈদুল ফিতর, অন্যটি ঈদুল আযহা। এ দুটি দিবসই আসে মহান স্রষ্টার ইবাদত, আনুগত্য এবং মানব কল্যাণে নিবেদিত ত্যাগ- তিতিক্ষার প্রেক্ষাপটে। এখানে কোন ব্যক্তিপূজা, জাতীয় পূজা ও অন্যান্য ক্ষতিকর কোন বিষয়ের লেশমাত্রও নেই। ঈদুল ফিতর আসে দীর্ঘ ১ মাস তারাবিহ, রোজা, শবে কদর ইত্যাদি ইবাদত উদযাপনের পর। ঈদুল ফিতরের দিবসটিও আরম্ভ হয় স্বচ্ছল লোকদের উপর গরীব ও নিঃস্বদেরকে বাধ্যতামূলক দান (ফিতরা), দু’রাকাত নামাজ, দোয়া ও উন্নত জীবনাচারে নির্দেশনামূলক বক্তব্য (খুতবা) শুনার মধ্য দিয়ে। আর ঈদুল আযহা আসে ইসলামের মৌলিক ইবাদত হজ্জ পালনের প্রেক্ষাপটে। আর এটিও আরম্ভ হয় আল্লাহর জন্য দু’রাকাত নামাজ, দোয়া ও খুতবার মাধ্যমে। নামাজের পর স্বচ্ছল লোকজনকে গরীবদের মাঝে বাধতামূলকভাবেই মাংস দান করতে হয়। এ দুটি দিবসই ‘আল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকবর, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, আল্লাহু আকবর ওয়ালিল্লাহিল হাম্দ’ (অর্থ ঃ আল্লাহ সবচেয়ে মহান, আল্লাহ ছাড়া কোন ‘ইলাহ্’ (নিঃশর্ত শাসন ও আনুগত্যের অধিকারী ইবাদত-উপসনার যোগ্য) নেই। আল্লাহ সবচেয়ে মহান এবং সমস্ত প্রশংসা তাঁরই জন্য নিবেদিত)- এই তকবীর ধ্বনির মাধ্যমে সাহাবারা আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে দিতেন। এসব বিষয় থেকেই ইসলাম প্রবর্তিত ঈদের ন্যায় আনন্দ ও জাতীয় দিবসের প্রকৃত তাৎপর্য সহজে অনুধাবন করা যায়। যেমন ধরুন, এই যে ঈদের সময় আমরা আল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকবর বলে ধ্বনি দিই- এর কী তাৎপর্য? এই ধ্বনি বা শ্লোগানটি একটি ইবাদত। এটা নিছক মুখ থেকে উচ্চারিত হয়ে অনর্থক বাতাসে বিলীন হয়ে যাওয়ার মত কোন ধ্বনি মোটেও নয়। আমরা পৃথিবীতে জন্ম নিয়ে আসার সাথে সাথে আমাদের কানে এ ধ্বনিটি (আজান) শুনানো হয়। আবার এটি দিয়েই আমাদের জীবনের সমাপ্তি টানা হয় (অর্থাৎ জানাযার নামাজে এই ধ্বনি বা তকবীরটি বার বার উচ্চারণ করা হয়)। আমরা নামাজের জন্য ডাকি এই ধ্বনির মাধ্যমে- নামাজের জামায়াত শুরু হয় এটি দিয়ে (একামত)। এটি দিয়েই নামাজে প্রবেশ করি। নামাজের মাঝখানে অনেকবার এটি আমরা উচ্চারণ করি। মুসলিম জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য ধ্বনি বা শ্লোগান হল- এই ‘আল্লাহু আকবর’। এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি শ্লোগান- এর তাৎপর্য হলো ঃ আল্লাহ সবচেয়ে মহান, সবচেয়ে বড়, আল্লাহর উপর কেউ নেই, আল্লাহর বিধানের উপর কোন বিধান নেই। সবচেয়ে বেশী সমীহ ও সম্মান করতে হবে- সব চেয়ে বেশী ভয় পেতে হবে একমাত্র তাঁকেই। সবচেয়ে বেশী ভালবাসতেও হবে একমাত্র আল্লাহকেই। কোন ব্যক্তি, বস্তু, বিষয় আল্লাহর চেয়ে বেশী প্রিয়- বেশী মূল্যবান হতে পারে না। আল্লাহর বিধান ত্যাগ অমান্য ও অস্বীকার করার বিনিময়ে যদি গোটা পৃথিবীর সব স্বার্থ, সমস্ত পদ- সম্পদ, সুখ-শান্তি, ভোগ-বিলাসিতা হাতছানি দিয়ে ডাকে তাহলেও এসব কিছুকে তুচ্ছ ভাবে পায়ের তলে পিষ্ট করে সম্মুখে এগিয়ে যেতে হবে ‘আল্লাহু আকবর’ (আল্লাহ সবচেয়ে মহান) শ্লোগান দিয়ে।
কুরবানির তাৎপর্য ঃ নিছক গরু, মহিষ, ছাগল ইত্যাদি পশু জবাই করে খাওয়ার মধ্যেই কুরবানির আসল তাৎপর্য নিহিত হয়। কুরবানির আসল তাৎপর্য হল আল্লাহর সুস্পষ্ট বিধানের কাছে নিজেকে সমর্পিত করে দেয়া। কুরবানির ইতিহাসের প্রাণ পুরুষ দু’জন মহান নবী হযরত ইব্রাহিম (আঃ) ও তাঁর পুত্র হযরত ইসমাইল (আঃ)’র কুরবানির ঘটনা প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা ‘ফালাম্মা আসলামা’ (অর্থ ঃ তারা উভয়ে যখন আমার বিধানের সামনে নত হলো- সুরা আসসাফ্ফাত-১০৩) বলে কুরবানির এ দিকটির প্রতি আলোকপাত করেছেন। যেখানে নিজের চাওয়া পাওয়া বা অন্য কোন বিষয় আল্লাহর বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে সেখানেই সব সব বিষয়কে নির্দ্বিধায় কুরবানি দিয়ে আল্লাহর বিধান ও তার সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য অগ্রাধিকার দিতে হবে। কুরবানির দোয়া থেকেও কুবরানির তাৎপর্য বুঝতে পারা যায়। কুরবানি দেয়ার সময় আমরা কোরআনে উল্লেখিত যে দোয়াটি পাঠ করি তার অর্থ হল “আমি সর্বান্তকরণে আমার দৃষ্টি সেই সত্তার দিকে ফিরে নিয়েছি, যিনি আকাশ সমূহ এবং পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং আমি শির্কবাদীদের অর্ন্তভুক্ত নই। নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কুরবানি এবং আমার জীবন-মৃত্যু সবকিছুই বিশ্বের মালিক ও প্রতিপালকের জন্য। তাঁর কোন শরিক বা অংশীদার নেই। আমাকে এরই আদেশ দেওয়া হয়েছে এবং আমি আনুগত্যের শীর অবনতকারীদের মধ্যে প্রথম আছি। হে আল্লাহ এসবই তোমারি পক্ষ থেকে দেয়া এবং তাই তোমার জন্যই নিবেদিত করলাম”। এরপর বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবর বলে কুরবানি দিই। বিছমিল্লাহ অর্থ একমাত্র আল্লাহর নামে, একমাত্র তারই উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করলাম। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, আল্লাহর সৃষ্ট পশু, একমাত্র তারই নামে উৎসর্গিত হওয়ার অধিকার আছে। এদিক দিয়ে মানুষের উপর সমস্ত পশুর অধিকার আছে যে, আল্লাহর নামেই তাদের জীবন উৎসর্গিত হবে। কোন দেব-দেবি বা অন্য কারো বা উদ্দেশ্যে নয়। এভাবে কুরবানি কুরবানি দাতার মধ্যে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের বাসনা সৃষ্টি করে। আর এই আনুগত্য কেবলই নামাজ ও মসজিদের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না- এই আনুগত্য হবে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বত্র এবং চিন্তা চেতনা, জীবন ও কর্মের সব খানেই আল্লাহর বিধানের ভিত্তিতে রচিত জীবনাদর্শকে নিজের ও সমাজের জীবনাদর্শ হিসাবে গ্রহণ করা। জীবনের প্রতিটি পদে পদে আল্লাহর বিধান লংঘন করে আল্লাহর আনুগত্য লাভের আইনগত অধিকারকে অস্বীকৃতি জানিয়ে বাস্তব জীবনে হালাল হালামের তোয়াক্কা না করে, জাতির উপর দুর্নীতির মাধ্যমে দারিদ্র্য ও দুর্যোগ চাপিয়ে দিয়ে জুলুম অত্যাচার মূলক জীবনাচার অবলম্বন করে- আবার কুরবানির ঈদে বিশাল বিশাল পশু কুরবানি করার মধ্যে কোন স্বার্থকতা নেই। কুরবানির এই তাৎপর্য প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “এসব পশুর, গোশত ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, কিন্তু পৌঁছে তার কাছে তোমাদের তাকওয়া”- সূরা আল-হাজ্জ-৩৭। তাকওয়ার অর্থ আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের (সাঃ) আনুগত্য মূলক জীবনাচার অবলম্বন করা। হাবিল ও কাবিলের দেয়া কুরবানি কবুল করা বা না করা প্রসঙ্গে কুরআনে উল্লেখিত হয়েছে যে, “আল্লাহ মুত্তাকিদের (আল্লাহ ও তার রাসুলের আনুগত্য অবলম্বনকারী) থেকেই (কুরবানি) কবুল করেন”-সূরা আল-মায়িদা-২৭।
পশু সম্পদ আল্লাহর বিশাল নিয়ামত ঃ আল্লাহ মানুষকে যে অসংখ্য নিয়ামত দান করেছেন তার মধ্যে বিচিত্র পশু-পাখি, জীব-জন্তু মানুষের জন্য বিশাল নিয়ামত। এর মধ্যে কিছু প্রাণী ও জীব-জন্তু কে হিংস্র করে সৃষ্টি করলেও আবার কিছু প্রাণীকে বাহ্যত অপ্রয়োজনীয় ও তুচ্ছ মনে হলেও প্রকারান্তরে সেগুলো মানুষ ও তার পরিবেশ সুরক্ষায় বিরাট ভূমিকা রাখে। কিছুসংখ্যক প্রাণীকে-প্রকৃতিতে সৃষ্ট এবং বিজ্ঞানীদের বহুল আলোচিত- ‘খাদ্য-শৃঙ্খল’র অংশ হিসাবে মানুষের জন্য খাদ্য হিসাবে অত্যন্ত সুস¦াদু ও তাদের দেহের জন্য খুবই উপকারি, উপযোগী ও অপরিহার্য করে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, তিনি চতুষ্পদ জন্তু সৃষ্টি করেছেন এতে তোমাদের জন্য রয়েছে তাপ-উষ্ণতার উপকরণ। রয়েছে নানাবিধ উপকারিতা এবং কিছু সংখ্যককে তোমরা খাদ্যে পরিণত করো”(-সুরা আননাহল-০৫)।
প্রাণীর প্রতি ইসলামের দয়া ঃ ইসলামে মুষ্টিমেয় কিছু সংখ্যক প্রাণীকে এবং মানুষেরই বিশেষ প্রয়োজনে এবং তাও যৌক্তিক সীমার ভিতরে থেকে (কারণ, ইসলামে খাদ্যের অপচয়, অপব্যয়, অপব্যবহার সবসময় কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ) খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করার অনুমতি রয়েছে। তার মানে এই নয় যে, ইসলাম এসব প্রাণী বা অন্য কোন প্রাণীর প্রতি নিষ্টুর আচরণ মেনে নেয়। না, তা কখনো নয়। ইসলাম প্রাণী জগতের প্রতি মানুষকে অত্যন্ত দয়া পরবশ হতে বলেছে। কারণ এগুলোকে অনেক ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালা মানুষের সেবা ও কাজে নিয়োজিত করেছেন। এরা তাদের কোন দুঃখ দূর্দশার কথা ভাষায় ব্যক্ত করতে পারে না। এ কারণে ইসলাম এগুলোর প্রতি সর্বাধিক দয়া প্রদর্শন করতে বলে। হাদিসে আছে যে, একটা পিপাসার্থ কুকুরকে পানি পান করানোর কারণে এক ব্যক্তিকে তার অপরাধগুলো মাফ করে দিয়ে আল্লাহ তাকে বেহেশতে প্রবেশ করান- (বুখারী মুসলিম)। “প্রত্যেক প্রাণীর সেবা ও যতেœ তোমাদের জন্য সওয়াব রয়েছে”-(বুখারী মুসলিম)। যে কোন প্রাণীকে অনাদর, অযতœ ও নির্যাতন করলে জাহান্নামে যেতে হবে। হাদিসে আছে যে, এক মহিলা একটি বিড়ালকে খাদ্য না দিয়ে বেঁধে রাখার কারণে জাহান্নামে প্রবেশ করে”- বুখারী মুসলিম। নবী (সাঃ) অন্যায়ভাবে একটি পাখি হত্যাও কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। “কোন মানুষ যদি অন্যায়ভাবে কোন পাখি হত্যা করে কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে সে সম্পর্কে জবাবদিহিতা করতে হবে” (নাসায়ি)। ইসলামী আইনে পশুর খাদ্য, পানীয় ও চিকিৎসার দায়িত্বভার মালিকের উপর অর্পন করেছে। কোন মালিক যদি এক্ষেত্রে দায়িত্বহীনতার পরিচয় দেয় তাহলে তাকে সেসব পশু অন্য কোন দায়িত্বশীল ব্যক্তির নিকট বিক্রি করে দিতে বাধ্য করা হবে। আর কোন পশু বা প্রাণী যদি কারও ক্ষতি করে ফেলে তাহলে ঐ পশুর মালিকের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবী করা যায়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট প্রাণীকে কষ্ট দেয়া বা গালমন্দ করা নিষেধ, এটা ইসলামের আইন। এক্ষনে বিশ্ববিখ্যাত একজন ইসলামী চিন্তা নায়কের কিছু বক্তব্য উদ্ধৃত করছি। বক্তব্য গুলো এখন থেকে ৬০ বৎসর পূর্বের হলেও আমাদের এই যুগেরও মূর্খ, অর্ধ শিক্ষিত ইসলাম বিদ্বেষী মতলববাজ ও সরলমনা কিছু লোকদের কুরবানি সম্পকির্ত বিভ্রান্তির জবাব রয়েছে। এ উদ্বৃতির মাধ্যমে আমার আলোচনা শেষ করছি। “…আসলে আমাদের চিন্তার অবনতি এবং চারিত্রিক অধঃগতির এর চাইতে লজ্জাস্কর পরিণতি আর কি হতে পারে যে, আমাদের যে কোন ব্যক্তিই দ্বীনের প্রমাণ্য বহুজন স্বীকৃত ও সর্ববাদী সম্মত সত্য এবং তার বুনিয়াদগুলোর বিরুদ্ধে বেপরোয়াভাবে এবং নির্বিকার চিত্তে চ্যালেঞ্জ করার দুঃসাহস করে, তারপর দেখতে দেখতে তার সমর্থনেও কিছুলোক অগ্রসর হয়। অথচ তার কাছে শধু একটি ভূয়া দাবী ছাড়া অন্য কোন দলীল প্রমাণের অস্তিত্বই নাই। অনেক কাঠখড় পোড়াবার পর জনসাধারণকে প্রতারিত করার জন্য প্রতি বছর খুব বেশী মূল্যবান মনে করে একটি যুক্তি (?) বার বার পেশ করা হয়। বলা হয়, প্রতি বছর কুরবানীতে লক্ষ লক্ষ টাকা নষ্ট করা হয়। পশু কুরবানী না করে সেই টাকাগুলো জনকল্যাণ অথবা জাতীয় উন্নয়ন মূলক কোন কাজে ব্যয় করা উচিত। কিন্তু কথাটি নিতান্তই ভ্রান্ত। এর কয়েকটা কারণ আছে। প্রথমতঃ কুরআন এব সুন্নাহ থেকে যে বস্তুটি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ বলে প্রমাণিত, সে সম্পর্ক কোন মুসলমান- যদি সে সত্যিকার মুসলমান হয়- একথা চিন্তাই করতে পারে না, তার জন্য অর্থ সম্পদ অথবা সময় মেহনত ব্যয় করলে তা নষ্ট হয়ে যায়। একথা যে চিন্তা করে, সে এসবের চাইতে অনেক বেশী মুল্যবান তার ঈমানকেই নষ্ট করে। দ্বিতীয়ত ঃ ইসলামের দৃষ্টিতে জনকল্যাণ এবং জাতীয় উন্নয়নমূলক কাজেরও একটি মূল্য আছে। কিন্তু তার দৃষ্টিতে এর চাইতেই অনেক বেশী মুল্যবান কথা হলো এই যে, মুল্যবান যে কোন প্রকারেরই হোক, শির্ক থেকে দূরে থাকবে, তৌহিদ-বিশ্বাস তার চিন্তা ও কর্মের সাথে পুরোপুরি সংযোজিত হবে এবং তাদেরকে শক্তিশালী করবে। আল্লাহর শোকর গুজারী, তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি এবং ইবাদত বন্দেগী করার অভ্যাস তার সমগ্র জীবনের শিকড় গেড়ে বসে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানের উদ্দেশ্যে সে নিজের সব কিছু কুরবান করার জন্য প্রস্তুত থাকবে। এ উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্যে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল যে কাজগুলোকে প্রয়োজনীয় মনে করেছেন, কুরবানীও তার অর্ন্তভুক্ত। কুরবানীর জন্যে অর্থ সম্পদ ব্যয় করা, জন কল্যাণ ও জাতীয় উন্নয়নের কাজে ব্যয় করার চাইতে অনেক বেশী মুল্যবান। একে অপচয় সেই ব্যক্তি মনে করে, যার মূল্যবোধ আসলে ইসলামের মুল্যবোধ থেকে পৃথক হয়ে গেছে। তৃতীয়ত ঃ আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সাঃ) যে ইবাদতের জন্যে যে পদ্ধতি নির্ধারিত করেছেন, অন্য কোন বস্তু তার প্রতিবদল হতে পারে না। অবশ্য আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল (সাঃ) নিজেরাই যদি দুটো অথবা তিনটে বিকল্প পদ্ধতি আমাদের সামনে পেশ করতেন, তারপর আমাদেরকে তার মধ্য থেকে যে কোন একটা গ্রহণ করার এখতিয়ার দিতেন, তাহলে তো কোন কথাই ছিল না। তা যখন নয়, তখন রাসুলুল্লাহ (সাঃ) যেভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, সেভাবেই প্রত্যেকটি হুকুম তামিল করাই আমাদের উপর ফরয। আমরা স্বেচ্ছাকৃত ভাবে তার জন্য কোন বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারি না। নামাযের পরিবর্তে কোন ব্যক্তি যদি তার সমস্ত ধন দৌলত দান করে দেয়, তাহলে তা এক ওয়াক্তের নামাজের প্রতিবদল হতে পারে না। অনুরূপভাবে কুরবানীর পরিবর্তে যতো বড়ো নেকী আপনি করুন না কেন, তা কখনো ঈদুল আযহার তিন দিন সজ্ঞানে কুরবানী না করার প্রতিবদল হতে পারে না এবং এ কাজটি সম্পন্ন করার পেছনে যদি এমন কোন মনোভাব থাকে যে, এ ইবাদতের জন্য আমরা খোদা ও তাঁর রাসুলের (সাঃ) চাইতে ভালো এবং উন্নততর (?) একটা পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছি, তাহলে নেকীতো দূরের কথা ভীষণ গোনাহগার হতে হবে।
তারপর দ্বীনি দৃষ্টিভংগী হতে দূরে সরে গিয়ে নিছক সামাজিক দৃষ্টিভংগিতে এই “অপচয়ের” অদ্ভুত ধারণাটি বিশ্লেষণ করুন। দুনিয়ায় এমন কোন জাতিই নেই, যারা তাদের পালা-পার্বন এবং জাতীয় ও আর্ন্তজাতিক উৎসবে লক্ষ লক্ষ, কোটি-কোটি টাকা খরচ করে না। নিছক অর্থের মাপকাঠিতে বিচার করার এবং টাকার তুলাদণ্ডেওজন করার চাইতে এগুলোর তমদ্দুনিক, সামাজিক এবং নৈতিক উপকার অনেক বেশী। ইউপরোপ এবং আমেরিকার কোন কঠোর জড়বাদীকেও আপনি এ কথা স্বীকার করাতে পারবেন না যে, প্রতি বছর বড় দিনের উৎসবে সমগ্র খৃষ্টান জগত যে অজস্র অর্থ ব্যয় করে, সেগুলো “অর্থের অপচয়”। বরং আপনার এ কথাটিকে সে পুনর্বার আপনারই মুখে ছুড়ে মারবে। সে কোন চিন্তা না করেই জবাব দেবে, সমগ্র দুনিয়ার খৃষ্টানরা হাজার হাজার সম্প্রদায়ে এবং রাজনৈতিক দলে বিভক্ত, এই শতধা বিচ্ছিন্ন জাতি ভাগচক্রেই আর্ন্তজাতিক পর্যায়ে যদি একটা উৎসব পালনের সুযোগ লাভ করে থাকে, তাহলে এর সামগ্রিক ও নৈতিক উপকার এর অর্থ ব্যয়ের চেয়ে অনেক বেশী। হিন্দুরাও তাদের পূর্জা পার্বন এবং উৎসব অনুষ্ঠানাদিতে যে অর্থ ব্যয় করে তাকে অর্থের তুলাদন্ডে ওজন করতে তারা কখনো রাযী হয় না। কেননা এভাবে তাদের মধ্যে একটা ঐক্যসূত্র গড়ে তোলার জন্য বিরাট পরিবেশ সৃষ্টি হয় ; নচেৎ তাদের মধ্যে বিভেদ-বৈষম্য এবং জাতিভেদ এতো বেশী যে কখনো একস্থানে একত্রিত হয়ে তারা এক জাতিতে পরিনত হতো পারতো না। দুনিয়ার বিভিন্ন জাতি মাঝে মাঝে সংঘবদ্ধভাবে যেসব সামাজিক উৎস পালন করে থাকে, সেগুলোও ঠিক এই ধরণের। প্রত্যেকটি উৎসব একটা অনুভূত আকৃতির প্রত্যাশি এবং এই আৃকতিকে বাস্তবায়িত করার জন্য অনেক কিছু ব্যয়িত হয়। কিন্তু কোন জাতিও কখনো ও এ আহম্মুকীর কথা চিন্তা করে না যে, শুধু স্কুল-কলেজে হাসপাতাল আর কারখানার কাজেই সবকিছু খরচ করা উচিত আর এসব উৎসব- অনুষ্ঠান একেবারেই নিরর্থক।
অথচ আমাদের ঈদুল আযহার যে উন্নত এবং আধ্যাত্মিক, মানসিক ও নৈতিক প্রাণশক্তি বিদ্যমান, দুনিয়ার অন্য কোন জাতির উৎসব-অনুষ্ঠানাদিতে তা নেই। আমাদের ঈদ উৎসবের মতো অন্য কোন জাতির উৎসব পালন পদ্ধতি এতো বেশী শির্ক ও নৈতিকতা বিরোধী কার্যাবলী এবং নোংরামী বিবর্জিত নয়। আমাদের ঈদের ন্যায় দুনিয়ার অন্য কোন উৎসবের জন্যে আল্লাহর কিতাবের এবং তাঁর রাসূলের (সাঃ) নির্দেশ নেই। তবুও কি আমরা জড়বাদীতায় এখন সবাইকে পেছনে ফেলে যাবার সংকল্প করে নিয়েছি? তাছাড়া কুরবানীতে “অর্থের অপচয়ের” তাৎপর্যই বা কি? একে অর্থের অপচয় কেমন করে বলা যেতে পারে? আমাদের জাতির যেসব লোকেরা পশু পালন এবং তার ব্যবসায় করে, কুরবানীর জন্যে ক্রীত জানোয়ারের মূল্য তাদেরই পকেটে প্রবেশ করে। একে যদি “অর্থের অপচয়” বলা হয়, তাহলে দেশের সমস্ত বাজার ও দোকান পাট বন্ধ করে দিতে হবে। কেননা সেখানে জিনিসপত্র ক্রয় করার দরুন প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার অপচয় হয়। তদুপরি পশু প্রাণী খরিদ করে তাকে কি মাটির নীচে পুঁতে ফেলে দেয়া হয়, না আগুণে নিক্ষেপ করা হয়? তাদের গোশত এই মানুষেরাই খায়। তবুও যদি একে অপচয় বলা হয়, তাহলে সারা বছর মানুষের খাদ্যের জন্যে যা কিছু ব্যয় করা হয়, যে কোন প্রকারেই তার পথ রোধ করা উচিত”। (লিখক ঃ খতিব, হযরত উসমান (রঃ) জামে মসজিদ, কক্সবাজার।)

Top